হাজারীবাগ ট্যানারিশিল্প: ৫০ বছর ধরে চলছে বর্জ্য শোধন ছাড়াই

প্রকাশ: July 28, 2015
tan

ঢাকার ট্যানারি শিল্পের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ২৮ জুলাই ২০১৫ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনদুটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

রাজধানীর হাজারীবাগে ১৯২টি ট্যানারির কোনোটিরই বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নেই। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বর্জ্যের শোধন ছাড়াই চলছে চামড়াশিল্পের এসব কারখানা। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অপরিশোধিত বর্জ্য এই শিল্পের শ্রমিক, আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বুড়িগঙ্গা নদীদূষণের প্রধান কারণও নদীসংলগ্ন হাজারীবাগের এই ট্যানারিশিল্প।

সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর, ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ট্যানারি থেকে প্রতিদিন প্রায় ২২ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন কঠিন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে আনুমানিক ১০০ টন। অবশ্য পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) সাম্প্রতিক এক জরিপে জানিয়েছে, হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময় প্রতিদিন কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০০ মেট্রিক টন। পবার দাবি, এতে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে।

হাজারীবাগ ট্যানারিশিল্প এলাকার কারখানা থেকে রাস্তাঘাট, পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থা, আশপাশের বস্তি—সবকিছুই ট্যানারির বর্জ্যে ভরা। বিশেজ্ঞদের মতে, পুরো এলাকাই বসবাস এবং কাজের জন্য অনিরাপদ। এরপরও হাজারীবাগে ট্যানারিশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কাজ করছে।

হাজারীবাগের ট্যানারিতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে যেসব রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়, এর মধ্যে আছে ক্রোমিয়াম, সিসা, সালফিউরিক অ্যাসিড, হাইড্রোজেন সালফাইট, ফরমিক অ্যাসিড, রং, তেল। এসব দ্রব্যমিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি চলে যায় নদীতে। অনেক ভারী ধাতু, চুন, পশুর মাংস, হাড়, দ্রবীভূত চুল, চর্বি, লবণ ইত্যাদি বর্জ্যও পড়ে থাকে যত্রতত্র। এসব বিষাক্ত ও বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য পানি, বায়ু, মাটিদূষণসহ জনস্বার্থের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অমলকান্তি দেব বলেন, তিনটি ধাপে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর মধ্যে প্রথম ধাপে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার পর তাতে ব্যাপক পরিমাণে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এরপর দুই ধাপেও রাসায়নিকের ব্যবহার রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, ক্রোমিয়াম, হাইড্রোজেন সালফাইটসহ রাসায়নিক উপাদানগুলো অপরিশোধিতভাবে প্রকৃতিতে মিশলে তা পরিবেশে ও মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক।

পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১৩ সালে একবারই কেবল এক অভিযানে তিনটি ট্যানারিকে ৬৮ লাখ টাকা জরিমানা করে। ওই বছর বে ট্যানারিকে ৪০ লাখ, আইয়ুব ট্যানারিকে ২০ লাখ এবং ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিনকে আট লাখ টাকা জরিমানা করে। এরপর আর কোনো অভিযান করতে পারেনি পরিবেশ অধিদপ্তর।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. আলমগীর গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই অভিযানের পরই রাজনৈতিক মহল ও মালিকদের কাছে থেকে প্রবল চাপ আসে। ফলে অভিযান পরিচালনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। এ ছাড়া, যেহেতু এসব ট্যানারি এখন স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় আছে, তাই আমরাও অভিযান বন্ধ করে দিয়েছি।’

সূত্র: প্রথম আলো

চামড়ার বর্জ্য আর ময়লা পানিতে সয়লাব

রাস্তার দুই পাশে ট্যানারির বর্জ্যের স্তূপ। সুয়ারেজের ময়লা পানিতে সয়লাব। ডাস্টবিন থেকে উপচে পড়া ময়লার দুর্গন্ধ। রাস্তা দখল করে রাখা হয়েছে ট্রাক। এসব সামলেই পথ চলতে হচ্ছে পথচারীদের। দুর্ভোগের এই চিত্র রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার ঢাকা ট্যানারির সড়কের। শুধু এই এলাকা নয়, হাজারীবাগ এলাকার বেশির ভাগ সড়কের অবস্থাই এমন। চামড়াশিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত এই এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ট্যানারিগুলো দীর্ঘদিন ধরে সাভারে স্থানান্তরের কথা বলা হলেও তা হয়নি। ট্যানারির কারণে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের ভোগান্তি। এই এলাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত। ওয়ার্ডের অন্য এলাকা হচ্ছে জিগাতলা, গজমহল, শিকারিটোলা, সোনাতনগড়, চরকঘাটা, মনেশ্বর, তল্লাবাগ, বাংলা সড়ক, সুলতানগঞ্জ ও মধুবাজারের কিছু অংশ। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ।

সরেজমিনে গতকাল সোমবার সকালে হাজারীবাগ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা ট্যানারি মোড় সড়কের ওপর চারটি ডাস্টবিন। রাস্তার এক পাশে খোলা ডাস্টবিনের ময়লা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, অন্যদিকে সুয়ারেজের পানিতে সয়লাব। ময়লার গন্ধে নাক চেপে চলছে পথচারীরা। হাঁটার রাস্তা বলতে তেমন কোনো জায়গাও অবশিষ্ট নেই। আর পুরো রাস্তার পাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট টং দোকান। এর ওপরেই রাস্তা দখল করে বড় বড় ট্রাক সারি করে রাখা হয়েছে। এক পাশে রাস্তা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ঠেলাগাড়ির স্ট্যান্ড, পাশেই ফুটপাতের ওপর হাজারীবাগ ঠেলাগাড়ি বহুমুখী সমবায় সমিতির কার্যালয় তৈরি করা হয়েছে। সাইনবোর্ডে বলা হচ্ছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অনুমোদিত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমিতির সভাপতি মজিবর রহমান দাবি করেন, তাঁদের কার্যালয় বৈধ। ডিএমপি অনুমোদিত। কিন্তু হাজারীবাগ থানার ডিউটি অফিসার আশরাফ আলী বলেন, এমন কোনো অনুমোদনের বিষয়ে তাঁর জানা নেই।

এলাকার ট্যানারি মোড় ও হাজারীবাগ থানা সড়ক, শেরেবাংলা রোডের ওপর ময়লা স্তূপ করে রাখা। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ধুয়ে আবার সেই ময়লা সুয়ারেজে গিয়ে মিশছে।

এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান কাজী বলেন, ময়লা পানিতে হাঁটতে হয়, আর ডাস্টবিনের ময়লার দুর্গন্ধে বমি আসার উপক্রম হয়। এখানে চামড়ার বর্জ্য আর ময়লা পানিতে টেকা দায়। আরেক বাসিন্দা লালন মিয়া অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশনের সুইপাররা সুয়ারেজের ময়লা তুলে রাস্তায়ই রাখে। সঠিক সময় তুলে না নেওয়ার কারণে আবার সেই ময়লা আগের জায়গায় চলে যায়। এ ছাড়া ময়লার দুর্গন্ধে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

মিলন ট্যানারির সামনে কথা হয় চা দোকানদার মো. হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ওই গলিতে বৃষ্টি হলে তো পানি ওঠেই। এ ছাড়া সুয়ারেজের পানিতেও রাস্তা ডুবে যায়। তিনি জানান, দুপুরের দিকে সব ট্যানারির বর্জ্য একসঙ্গে ছেড়ে দেয়। তাই দুপুরে এখানের বেশির ভাগ রাস্তায় সুয়ারেজের ময়লা পানি রাস্তায় এসে পড়ে। তখন ওই পানি মাড়িয়েই পথচারীদের চলতে হয়। চর্মরোগসহ নানা ধরনের রোগে ভুগছে অনেকেই।

এই এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, হাজারীবাগের মূল সমস্যা হচ্ছে, ট্যানারির বর্জ্য আর জলাবদ্ধতা। তাঁরা অভিযোগ করেন, অনেক দিন ধরে তাঁরা এসব সমস্যার সম্মুখীন হলেও এসব সমাধানে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এলাকার বাসিন্দা মো. মইনুল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘শুধু শুইনাই গেলাম ট্যানারি সরবো, বাস্তবে আর সরে না।’

ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়টি সরকারের হাতে। আমাদের কিছু দাবি এখনো পূরণ হয়নি। সে জন্য অনেক ট্যানারি স্থানান্তর হচ্ছে না।’

এলাকার সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কমিশনার মো. সেলিম বলেন, ‘শিল্প এলাকা, তাই ট্রাক বা ঠেলাগাড়ি আসে। তবে তিনি দাবি করলেন, এসব মালামাল আনা-নেওয়া করেই চলে যায়, থাকে না। রাস্তার ওপরে বর্জ্য থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিদিন রাতে ময়লা সিটি করপোরেশন থেকে পরিষ্কার করে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু রাস্তায় সংস্কারের কাজ চলছে, তবে বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ আছে। সিটি করপোরেশনে এলাকার সার্বিক উন্নয়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পাস হলেই আর সমস্যা থাকবে না।

সূত্র: প্রথম আলো

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন