প্রকৃতিকে বাঁচান, বাংলাদেশ বাঁচবে

প্রকাশ: May 14, 2015
large

বিডি রহমতুল্লাহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অধ্যয়ন শেষ করে নরওয়েতে পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা সমাপ্ত করেন। চাকরি জীবনে ইলেকট্রিফিকেশন বোর্ড, পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ও পাওয়ার সেলে কর্মরত ছিলেন। পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিবেশবাদী আন্দোলনের নিরমিত কর্মে বিডি রহমতুল্লাহ ১৪ মে ২০১৫ তারিখের বণিকবার্তায় লিখেছেন বাংলাদেশের প্রাণ প্রকৃতি নিয়ে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় সেটি হুবহু প্রকাশ করা হল আমরা ঢাকায়-

প্রকৃতিকে বাঁচান, বাংলাদেশ বাঁচবে
বি ডি রহমতউল্লাহ্

বিষয়টি মোটেই কাকতালীয় নয় যে, প্রায় আড়াইশ বছর আগে ঔপনিবেশিক আমলে এ দেশের ‘প্রধান’ সম্পদ নদ-নদী, খাল-বিল, বৈচিত্র্যময় সবুজ বাংলার অপূর্ব জলাশয়, নদীবাহিত জলরাশি ও বর্ণাঢ্য কৃষি অর্থনীতিতে আকৃষ্ট হয়ে এ ভূখণ্ডকে তারা উপনিবেশ বানিয়ে শাসন-শোষণের যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল, তা কি আজো বন্ধ হয়েছে? ভিন্ন কৌশলে শোষণ আজো অব্যাহতই আছে বলা যায়।

বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ, ধনী দেশের যন্ত্রপাতি নির্মাতা ও পুঁজি বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি বিনিয়োগের স্বার্থে নদী শাসন ও পানি ব্যবস্থাপনার নামে যেসব কুপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে, তা এ দেশকে অচিরেই পানিশূন্য তথা সম্পদশূন্য করে ছাড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী কৃষককুলসহ দেশের ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ প্রায় ১৩ কোটি লোক (১৬ কোটি বিবেচনায়) অত্যন্ত নির্মম মানবেতর জীবনযাপন করছে ও করবে। পানিসম্পদের ওপর এ নিষ্ঠুরতার ফলে দেশের যে সর্বনাশা ভূবিপর্যয়সহ এক মহাদুর্যোগ ঘনিয়ে আসছে, তা অবিলম্বে প্রতিহত করে দেশ ও দেশের জনগণকে বাঁচাতে সমাজের সচেতন জনগোষ্ঠীকে আর কালবিলম্ব না করে এখনি এগিয়ে আসতে হবে।
save_our_nature_by_takakoinwonderland-d6fuolc
একই সঙ্গে এ দেশের প্রধান সম্পদ নদ-নদী-জলাশয় তথা প্রকৃতিকে দখল বা হত্যার কথা বলছিলাম। নদী দখল করে আবাসন ও শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণ, নদীদূষণ করে নৌপথ অচল করে দেয়া, নদীপথকে বিপর্যস্ত করে সড়ক ও রেলপথের অপরিকল্পিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী হচ্ছে? দেশ জমি হারাচ্ছে, আর্সেনিক রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, বনসম্পদ উজাড় হচ্ছে, জমি উর্বরতা হারাচ্ছে, মত্স্যসম্পদ বিরান হচ্ছে, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, নির্মল আবহাওয়া বিরূপ ও কলুষিত হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে জমি তার গুণাবলির বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে, আর্সেনিক রোগ ছাড়াও বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবের ফলে জনস্বাস্থ্য প্রচণ্ড হুমকির মুখে পড়ছে।

আমাদের মতো রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি যে জন্য পর্যুদস্ত, তার অন্যতম একটি কারণ হলো— এসব দেশে উন্নত দেশের আধিপত্যে এমন সব পরিকল্পনা জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়, যা জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা তো করেই না, বরং এর বিপরীতে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়।

পানি হলো বহু সম্পদ রূপান্তর সক্ষমতায় বিশ্বের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। আমাদের বাল্যকালে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, পানির অপর নাম জীবন। এ কথা ১০০ ভাগ সত্যি। আমরা জানি, পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ অঞ্চলই জলাবৃত। সারা বিশ্বের পণ্য পরিবহনের ৯০ শতাংশই জলপথে আনা-নেয়া করা হয়। জলপথ যেমন নিরাপদ, তেমনি অনেক সাশ্রয়ী। মানুষের জীবন ধারণের জন্য যে আবহাওয়া প্রয়োজন, সে আবহাওয়া নির্মাণে মূল নিয়ামক শক্তি পানি। তাবৎ পৃথিবীর আমিষের ৭০-৮০ শতাংশের আবাসস্থল হচ্ছে পানি। যদিও একদল অবিবেচক প্রভাবশালীর নির্বিচার অত্যাচারে আজ মূল্যবান এ পানিসম্পদ নিঃশেষিত হয়ে এক বিষময় আবহাওয়ার সৃষ্টি করছে। এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভূমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন উদ্গীরণসহ কৃষিতে বিপর্যয় ঘটছে। এতে শুধু পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি নয়, এসিড বৃষ্টি, অসময়কালীন বন্যা, খরা, অনিয়ন্ত্রিত ও অনিয়মিত জলোচ্ছ্বাসসহ দেশে দেশে আবহাওয়ার বিরূপ পরিবর্তন এ সার্বিক ব্যভিচারের ফল হিসেবেই উদ্ভূত।
save_the_mother__save_nature__save_yourself_by_miss_simple-d61o54d
আসুন, আমরা বিশ্লেষণ করে দেখি আমাদের দেশে পানিসম্পদ কী পরিমাণ আছে এবং তা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি।

বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ৩১০। তবে এগুলোর আবার বহু উপনদী ও শাখা নদী আছে। আসলে আছে না বলে বলা যায় ছিল। তাহলে এই যে এতগুলো নদ-নদী-খাল-জলাশয় বেমালুম গায়েব হয়ে আমাদের দেশে এক তীব্র জল সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে আমাদের কী লাভ, কী ক্ষতি হচ্ছে? আমাদের মূলত এবং প্রধানত জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সস্তায় বলা যায়, বিনে পয়সায় সেচকার্য বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে আমরা বাধ্য হয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে বিদ্যুতায়ন, মোটর ও আনুষঙ্গিক যন্ত্র ক্রয়, সার ও উচ্চফলনশীল জমির ক্ষতিকারক বীজ ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ইত্যাদির দিকে ঝুঁকেছি। যদিও বলা হচ্ছে, কৃষির আধুনিকীকরণের জন্য এসব করা হচ্ছে। এখানে বোদ্ধাদের জন্য আরেকটু বিশ্লেষণ করে বলছি, কৃষিতে আধুনিকীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, তা কীভাবে করব এবং কার স্বার্থে করব। তা যদি দেশের সস্তা ও সাশ্রয়ী জলসম্ভারকে নষ্ট করে, ভূমির উর্বরতা নষ্ট করে, জমির-পানিস্তরের ক্ষতি করে আর্সেনিক সংকট সৃষ্টি করা হয় এবং পরবর্তীতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এ সংকট সমাধান, আবারো সংকট আবারো সমাধান এ চক্রে ঘুরতেই থাকি, তাতে তো দেশ ও জনগণের মুক্তি মিলবে না। আসলে সঠিক পরিকল্পনা সঠিক তথ্য থেকে বেরিয়ে আসে। আমি এখানে তথ্যগুলো তুলে ধরছি। সমাধান কীভাবে হবে, সে বিষয়ে আমরা সবাই তখন সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সক্ষম হব এবং সে পথে এগিয়ে যাব। কিন্তু আজ এ কথা সম্ভবত ঠিক যে, আমাদের দেশে কোনটি প্রধান জাতীয় সম্পদ, তার মূল্যমান কত, আর তা কীভাবে শোষিত হচ্ছে, তার সঠিক তথ্য আমাদের অনেকের কাছেই ঠিকমতো নেই। নেই বলেই এ কথা বলতে দ্বিধা নেই নিপীড়িত জনগণ, যারা শোষণের নগ্ন রূপটি সুস্পষ্টভাবে ধরতে পেরেছে, আর হতাশ নেত্রে দেখছে যে, যাদের এ শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কথা, তাদের নিদারুণ অনুপস্থিতি শোষকদের সাহস কী রকম বাড়িয়ে দিচ্ছে! নির্বাক জনতা অস্পষ্ট স্বরে শুধু একটি কথাই বার বার বলছে, এ পর্যন্ত শাসকদের আমরা দেখলাম, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, কিন্তু আমরা যাদের খুঁজছি, তাদের পাচ্ছি না।

আসলে এ শোষণ বলতে খাল-বিল, নদ-নদী, জলাশয় ও নদ-নদীবাহিত জল শোষণের কথাই বলছিলাম। নদী ও খালের তথ্যটি এখনো দেয়া হয়নি। এ কথা বলে রাখা ভালো যে, বাংলাদেশ শুধু জমির উর্বরতার দিকেই নয়, বিশ্বের এমন একটি ভাগ্যবান রাষ্ট্র, যার ধারণকৃত পানি শুধু লবণাক্তই যে নয় তা নয়, এ পানি রাসায়নিক গুণাগুণসমৃদ্ধ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এ জলে হাঙ্গর নেই, ভয়ঙ্কর কোনো জলজ প্রাণী নেই। অবশ্য প্রভাবশালী কিছু দস্যুর জন্য কিছু নদ-নদী-জলাশয়ের পানি বর্জ্য আবৃত হয়ে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, সে ভিন্ন কথা।

২৫-৩০ বছর আগে আমাদের নদী, উপনদী ও শাখা নদীর বিস্তৃতি দেশব্যাপী ছিল প্রায় ২৬ হাজার কিলোমিটারের মতো, যা এখন দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কিলোমিটারে। এবার ভাবুন, মাত্র ৫৫ হাজার বর্গমাইলব্যাপী এলাকা এবং দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে, উত্তর-দক্ষিণে সোজাসুজি তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বৈমানিক দূরত্ব যদি মাপি, তাহলে তা হবে ৪০০ মাইল (৬০০ কিলোমিটার), তেমনি প্রস্থে অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিমে সবচেয়ে লম্বা লাইন যা হয়, তা সিলেটের জকিগঞ্জ থেকে নওয়াবগঞ্জ জেলার বিস্তৃতি হবে ৩০০ মাইল (৪২০ কিলোমিটার)। ছোট্ট একটি অঞ্চলে এত বিস্তৃত নদীপথ হবে নিশ্চিত সরলরেখা— ঘর থেকে ঘরে, হাট থেকে হাটে জলের ছল ছল করা হূদয় নিংড়ানো মন ভুলানো শব্দে চলাচলে মাত্র বিঘার দূরত্বে— যেখানে রাস্তা, রেলপথ বা অন্য সব ধরনের যোগাযোগের রাস্তা হবে ন্যূনতম এর দ্বিগুণ, অনেক কণ্টকাকীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর ও ব্যয়বহুল তো বটেই।

এ চমত্কার ও প্রকৃতির অসামান্য বৈচিত্র্যে ভরা জলপথ হবে সোজাসাপ্টা হিসেবে উত্তর-দক্ষিণে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে ৮৫০ কিলোমিটার। এটা কি ভাবা যায়, এই কয়েক দিন আগেও সব জেলা-উপজেলা নদী দ্বারা সংযুক্ত হয়ে প্রাকৃতিকভাবে আমরা সারা দেশে বিস্তৃত জলপথ পেয়ে গিয়েছিলাম ২৬ হাজার কিলোমিটারের মতো! এক অঞ্চলের সঙ্গে আরেক অঞ্চল নদী-খাল দ্বারা সংযুক্ত হওয়ায় সাশ্রয়ী হারে পণ্য স্থানান্তরসহ নদীতে যদি সারা বছর এত পানি ধারণ করতে পারতাম, তাহলে এ দেশের জমির উর্বরতা কত বৃদ্ধি পেত ভাবা যায়। পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে আর্সেনিক সংকট আর হতো না, সেচের জন্য আড়াই হাজার মেগাওয়াট খামাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে জমি নষ্ট করে বিদ্যুৎ লাইন টানার অর্থ ব্যয় করতে হতো না, ফসিল ফুয়েলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আবহাওয়া নষ্ট করতে হতো না, কৃষি ফসলসহ সব ধরনের ফলমূল উৎপাদন, বনজ ও ভেষজ বৃক্ষ বৃদ্ধিতে অনৈতিক ও উঁচু দামের বিদ্যুতের সাহায্য প্রয়োজন হতো না, কত লক্ষ কোটি টন মত্স্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেত, স্বাভাবিক নদী স্রোতে পরিবেশবান্ধব কত মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেতাম, নদ-নদী আর সবুজের সমারোহে অপূর্ব বৈচিত্র্যময় এ সুন্দর প্রকৃতিতে আকৃষ্ট হয়ে কত লাখ পর্যটক এ দেশে ভ্রমণ তৃষ্ণা মেটাতে আসত, পানির অবদান কত লক্ষ কোটি হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল পালন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখত, কী পরিমাণ বনাঞ্চল বৃদ্ধি পেত এবং আবহাওয়ায় এক লক্ষণীয় ইতিবাচক পরিবর্তন হতো? এখানে আবারো একটি কথা সবার বিবেচনায় বলছি, গণমানুষসহ সব ধরনের পণ্য পরিবহনে জলপথে ব্যয় হচ্ছে সাধারণ হিসাবে স্থল ও রেলপথ থেকে ৬৬ শতাংশ কম। অর্থাৎ রেল ও সড়কপথে প্রতি কিলোমিটারে যদি ব্যয় হয় ১ টাকা, সেক্ষেত্রে জলপথে সে ব্যয় হবে ৩৫ পয়সা। তাহলে ভেবে দেখুন, পণ্যসহ গণমানুষের চলাচল ব্যয় কমলে দ্রব্যমূল্যের ওপর এর কী দারুণ এক ধনাত্মক প্রভাব পড়ত। কেউ কেউ যদি বলে থাকেন, জলপথে জলযান চলে ধীরলয়ে, সময়ের অপচয়, তাতে পচনশীল দ্রব্যের ক্ষতি হবে ইত্যাদি।

সবার অবগতির জন্য এটা বলা বোধহয় সমীচীন যে, ভিয়েতনাম বিপ্লবের পর পরই যে কাজটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তারা করেছে তা হলো, দেশটি পানি ও নদীকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে জনগণের কাছে পানির প্রাপ্যতাই শুধু নিশ্চিত করেনি, দেশটির নদীর নাব্য ঠিক রেখে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করেছে, জলপথকে গুরুত্ব দিয়ে জমির উর্বরতা ও মত্স্য সম্পদ আহরণে প্রচণ্ড সফলতা অর্জন করেছে। প্রাকৃতিক শোভা বৃদ্ধি করে লাখ লাখ পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এরই মধ্যে ভিয়েতনাম তার জলযানে সোলার ইঞ্জিন বসিয়ে জলযানগুলোর গতি বৃদ্ধি করেছে। নিকট ভবিষ্যতে সে জলযানগুলোকে আরো সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই মধ্যে ওই দেশে জমি ও নদী নষ্ট করে ধনিক শক্তিগুলোর ব্যবসা বৃদ্ধিতে অনৈতিক সহায়তা আর দিচ্ছে না। আর এতে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হচ্ছে না এবং জলবায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে না। ভিয়েতনামের পক্ষে এটা কেন সম্ভব হয়েছে? সম্ভব হয়েছে এজন্যই যে, ভিয়েতনাম সরকার একটি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। আর সে বিপ্লব ছিল বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। সব ধরনের শোষণ ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে, তাদের দীর্ঘদিনের লড়াই সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে ভিয়েতনাম সরকারের নেতৃত্ব শুধু সচেতনই নয়, পোড় খাওয়া দেশপ্রেমিক ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে এতই সুদৃঢ় অবস্থানে থেকে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ভিয়েতনাম দীর্ঘ ৫০ বছর লড়াই করেও আজ কোথায় নিয়ে এসেছে— তা শুধু একটি কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থে যে কোনো পরিকল্পনাই ফলদায়ীভাবে সফল হতে বাধ্য।

নদী ও জল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শুধু একটি কথাই বলা যায়, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অপরিণামদর্শী পরামর্শে আমাদের দেশের বিভিন্ন সরকার নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার নামে এত বছর যেসব ভ্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আসছে; সে বিষয়ে সচেতন জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তোলাই যে বাঁচার একমাত্র উপায়, গণতান্ত্রিক আন্দোলন তথা দেশ ও জনগণের স্বার্থে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় যারা সামনের কাতারে আছেন, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করলে এবং সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে বিজয় অর্জনের লক্ষ্য স্থির করলে একমাত্র নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় ও জলাভূমি এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করাই যে আজ প্রধান জাতীয় কর্তব্য, তাদের তা সহজে বোঝার কথা।

দেশ বাঁচাতে অবশ্যই আমাদের প্রধানত গ্রামীণ অর্থনীতিতে বর্ণাঢ্য বিস্তৃতি ঘটাতে হবে। কৃষি অর্থনীতির আধুনিকীকরণ তথা যান্ত্রিকীকরণের পথে এগিয়ে শিল্পায়নের দিকে এগোতে হবে। আর পানিবাহিত নদী-খালের গুরুত্বকে সামনে ধরে বন্যার স্থায়ী সমাধানসহ উপরে বর্ণিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে সেটাই এ দেশের মূল অর্থনীতির বিস্তৃতিকে অনেক এগিয়ে নেবে।

আমরা যদি বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের নদীকে বাদ দিয়ে রেল ও সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি, তথাকথিত ‘প্রগতি ও উন্নয়ন’কে অন্ধভাবে সমর্থন করি, তা হবে দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি এক নিষ্ঠুর প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা; যা দেশপ্রেমিক কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নদী, কৃষিভূমি ও গ্রামই যে অর্থনীতির উন্নয়নে মূল ও প্রধান ভূমিকা রাখে, যারা জানেন না তাদের অনেক কিছু জানার ও শেখার আছে।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন