‘ধর্ষণের শাস্তি হোক শুধুই মৃত্যুদণ্ড’

প্রকাশ: June 2, 2015
Death sentence for Rape

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত তুলে ধরে এই প্রতিবেদনটি ২ জুন ২০১৫ তারিখের শিরোনাম করেছে দৈনিক ইত্তেফাক। আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হল-

নারীকে সম্মান না করার ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে: ডা.মোহিত কামাল

ধর্ষকদের ফাঁসির আদেশ দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে: রোকেয়া কবীর

ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

বিচারহীনতাই ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ: অ্যাডভোকেট সালমা আলী

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, ধর্ষণ আগেও ছিল এখনো রয়েছে। তবে মিডিয়ার বিকাশের কারণে এখন তা বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। একমাত্র সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেই এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। এ লক্ষ্যে তারা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার সুপারিশ করেছেন।

সম্প্রতি দেশে অভিনব কায়দায় ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠন দফায় দফায় মানববন্ধন, সভা, সেমিনার, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও এসব ঘটনা কমছে না। এ বিষয়ে নারীনেত্রী, মানোবিজ্ঞানী, রাজনীতিক ও মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার ও আসামিদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, অর্থনীতিতে জিডিপির ৬৫ ভাগ অর্জন যেখানে নারীর, সেই নারীই আজ নিরাপদ নয়। তারা কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। তিনি ধর্ষকদের ফাঁসির আদেশ দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানীতে ধর্ষণের শিকার গারো নারীর সবধরনের দায়িত্ব সরকারকে নেয়ারও আহবান জানান তিনি।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালে সারাদেশে ৪ হাজার ৬৪২টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৩৮টি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারাদেশে ৭৯৭টি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতিমাসে গড়ে অন্তত ৩০০টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হচ্ছে। তবে বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা মামলার চেয়েও দ্বিগুণ বলে মনে করেন অনেকেই।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা.মোহিত কামাল বলেন, ধর্ষণ একটি চোরাগুপ্তা হামলার মতো। সম্প্রতি যারা মাইক্রোবাসে ধর্ষণ করেছে তারা এর আগে কম করে হলেও ৫০টির মত ঘটনা হয়তো ঘটিয়েছে। একটি ঘটনায় ধরা পড়েছে। তিনি ধর্ষণের অন্যতম কারণ হিসেবে মানুষের জৈবিক তাড়না, ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতার অভাবকে দায়ী করে বলেন, অনেকে সমাজে নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখছে। নারীকে সম্মান না করার ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে, পরকীয়া বাড়ছে, এসব দেখে যখন সন্তান বেড়ে উঠছে, তখন সেই সন্তানের মুল্যবোধ, নৈতিকতা কাজ করছে না। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ধর্ষণের যেসব ঘটনা ঘটছে তার নেপথ্যে বিশ্বসংস্কৃতির একটা বড় প্রভাব রয়েছে। পর্নোগ্রাফির আগ্রাসন বন্ধ করে নৈতিকতা চর্চা বাড়াতে না পারলে সমাজে এ ধরনের ঘটনা কমানো কঠিন হয়ে যাবে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসারে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ মে পর্যন্ত সারা দেশে ২৪১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির মতে, ২০১০ সাল থেকেই ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৭৮৯, ২০১৩ সালে ৭১৯, ২০১২সালে ৮৩৬, ২০১১ সালে ৬০৩ এবং ২০১০সালে ৪১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৩, ফেব্রুয়ারিতে ৪৪, মার্চে ৪০ ও এপ্রিলে ৪১টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মে মাসে ৬৮টি ধর্ষণের ঘটনার সংবাদ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, তদন্তে ধীরগতি, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। শীঘ্রই এই হার কমাতে না পারলে অস্তিত্ব হারাবে আমাদের মূল্যবোধ। তাই এ সমস্যা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই সমাজ থেকে এর বীজ উত্পাটন করা দরকার।

বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ধর্ষণের মতো দানবীয় প্রত্যেকটি ঘটনার বিচার হওয়া উচিত। দিনের পর দিন এ ধরনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্যান্সারের মতো সমাজে বাসা বেধেছে ধর্ষণ। যদি এর উত্সকে উত্পাটন করতে না পারি তাহলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি।

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থার অভাবের কারণেই মূলত এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট চ্যানেল ও ইন্টারনেটসহ আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার ধর্ষণ বৃদ্ধির নেপথ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে দলমত নির্বিশেষে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। যেখানেই এধরনের ঘটনা ঘটবে সেখানেই একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারের কাছে বেশকিছু সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ধর্ষকদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যা দেখে কোন পুরুষ যেন আর ধর্ষণ করার সাহস না পায়। দেশে আদিবাসী নারীসহ সকল নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আক্রান্ত নারীর হয়রানি বন্ধ এবং ধর্ষকদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যমান আইনের সংস্কার, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে নারী সংসদ সদস্য ও নারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করার সুপারিশ জানিয়েছেন তারা। যে কমিটি সার্বক্ষণিক মামলা পর্যবেক্ষণ করবে এবং বিবৃতি দিবে।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, বিচারহীনতাই ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি ব্র্যাকের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৯ শতাংশ ধর্ষণ মামলায় আসামিদের কোনো শাস্তি হয় না। এই আইনজীবী আরও বলেন, নারীরা ধর্ষিত হওয়ার পর মামলা করার ব্যাপারে যেমন উত্সাহ দেখান না, তেমনি মামলা নিতেও চায় না পুলিশ। আবার মামলা হওয়ার পর পুরো বিষয়টির ‘নারীবান্ধব’ তদন্তও হয় না।

এদিকে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে গত ৩০ মে রাজধানীতে ৫০টিরও অধিক সংগঠন আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ফজলে হোসেন বাদশা এমপি বলেছেন, পহেলা বৈশাখের নারী নিপীড়নের ঘটনার সুষ্টু তদন্ত হলে, বিচার হলে; গারো নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটতো না। সরকারের একটি চোখ ও একটি কান নারীদের নিরাপত্তার জন্যে সর্বক্ষণ খোলা রাখার আহবান জানান তিনি।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন