লজ্জায়, ঘেন্নায়, প্রতিবাদে এই কালো রঙ

প্রকাশ: May 27, 2015
Untitled-1

রুবানা হক
তৈরী পোশাক শিল্প নিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে আমি তার উদ্দেশেই আমি লিখতে চেয়েছিল। আমি নিশ্চিত , তিনি মনে করেন তৈরী পোশাক শিল্পে কোন সমস্যা নেই, এই সেক্টরটি বিপুল পরিমান মুনাফা করে যাচ্ছে। এবং সংশ্লিষ্টরা সুযোগ পেলেই কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করে দিচ্ছে। তার বক্তব্যে আমরা অবাক হইনি, কারণ এরকমটাই তিনি মনে করেন। কিন্তু তার এই ‘উপলব্ধি’ বাজেটে প্রভাব ফেলে বিকাশমান শিল্পটির মূলে কঠারাঘাত করবে এই নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত। এ খাতে ৪ মিলিয়ন মানুষ কাজ করে যার মধ্য ৩ মিলিয়ন নারী।

আমাদের এখানে নারীর উন্নতিকে বাধাগ্রস্থ করে এমন সব যুক্তি খুব গ্রহণযোগ্যতা পায়, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা খুব সহজ হয়। একারণেই নারীর পক্ষে যত দ্রুত সম্ভব অবস্থান নিতে হবে। আমি এই কলামটি সে উদ্দেশেই লিখছি। কিন্তু তারপরেও আমি হতাশ হয়ে লক্ষ্য করি, আমরা একই ভুল ধারণায় থাকি, একই মিথ্যে তথ্য প্রচার করে একই রকম দুষ্টবুদ্ধির চর্চা করি। আমি পরিকল্পনা করেছিলাম তৈরী পোশাক শিল্প নিয়ে কিছু লিখব এ সপ্তাহে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে মাইক্রোবাসে একটি নারীকে গণধর্ষণের পর আমাদের দুষ্টবুদ্ধির প্রাচুর্য আমাকে বাধ্য করেছে বিষয় পরিবর্তন করতে।

আমার সাথে তার দেখা হয়েছিল এই পাশবিকতার ২৪ ঘণ্টা পর। খুবি রোগা একটা মেয়ে, ওজন চল্লিশ কেজির বেশি হবে না, হাসি মাখা একটা মুখ। তার চেয়ে বয়সে একটু বড় আরেকটি মেয়ে কি নিয়ে আমার কাছে এসেছিল সে। আমি প্রথমে বুঝতে পারি নি এদের মাঝে কার জীবনে এমন দুর্বিষহ ঘটনা ঘটেছে, কারণ সঙ্গের মেয়েটির চেহারা আরো অনেক বেশি ভীত-সন্তস্ত্র ছিল। কিন্তু কি অদ্ভুত, ঐ হাসিমাখে মুখের মেয়েটিই একটি মাইক্রোবাসে দেড় ঘন্টা পাঁচজন নরপশুর কাছে ধর্ষিত হয়েছে! আমি তার কাছ থেকে শিখে নিচ্ছিলাম সাহসের অভিব্যক্তি। আমরা ওই মেয়েটিকে সাধারণ অর্থে ‘গারো’ বলি। মেয়েটি সম্ভবত নিজেকে ‘চাক মান্দি’ (পাহাড়ি মানুষ) বা ‘আচি’ (পাহাড়ি) বলেই পরিচয় দিতে স্বস্তিবোধ করবে। তাদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক, তার নামের শেষাংশে তার মায়ের নাম, সে পাবে তার মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধীকার। কিন্তু সে তার জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসেছে, সেখানে বসবাস করছে। যেখানে তার মাতৃতান্ত্রিক সমাজের কিছুতো নেইই বরং প্রতিদিন তার মুখোমুখি হতে হয় একটি বিরুদ্ধ পরিবেশের।

প্রায় ৩০ মিনিট ধরে খুব স্পষ্টভাবেই সে পুরো ধর্ষণের ঘটনাটি বর্ণনা করল। সে জানাল, কীভাবে সে মাইক্রোবাসে কাঁচ ভেঙে পালাতে চেয়েছিল, কীভাবে একজনের পর একজন তাকে ধর্ষণ করেছে, কীভাবে তার আর্তনাদ চাপা দেয়ার জন্য ওরা তার মুখ চেপে ধরেছে, কীভাবে তারা শুরুতে তাকে বলেছিল যে তারা ‘ভদ্র’ ছেলে। এবং শেষপর্যন্ত পরপর চারজনের ধর্ষণ শেষ হবার পর গাড়ির ড্রাইভারও তার নোংরামি চরিতার্থ করল। সে জানাল, ধর্ষকদের একজনকে সে চিনতে পেরেছে। লোকটি তার কাজের যায়গার এসেছিল, দুজন বিদেশিকে সাথে নিয়ে। একজন বিদেশি আফ্রিকান ছিলেন। ধর্ষক লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তার বাসা কোথায়। এমনকি এই লোকটির নামও জানে মেয়েটি। ধর্ষণের সময় লোকটির কাছে একটা ফোন আসে, সে সময় লোকটির নাম ধরে ডাকা হয়েছিল। কী নির্মম পরিহাস, এই লোকটির নামের অর্থ শুভ্রতা, পবিত্রতা!

বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর তথ্যানুসারে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে আসা ৫হাজার ৩শত ২১টি এ ধরনের ঘটনার মধ্যে মাত্র ৪১টির বিচার হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এই ২১বছর বয়সের আদিবাসী ছোট্ট মেয়েটি কী সুবিচার পাবে, তার কী লাভ হবে তা বর্তমান লেখক জানে না। কারণ আমাকে প্রথমে নিশ্চিত হতে পারতে হবে মেয়েটি সেখানে নিরাপদে আছে।

পুলিশের উপর আমার বিশেষ আস্থা নেই। কিন্তু পুলিশের যে ওসি মেয়েটিকে উদ্ধার করেছেন, বাবা ও বোনকেসহ থানায় নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছেন তাকে ধন্যবাদ। কারণ অন্তত তিনি এইটুকুন করেছেন, তার আগে আরো দুটি পুলিশ স্টেশন মেয়েটির মামলা নিতেই রাজি হয় নি। গণধর্ষণের পর ঘেন্না, লজ্জা আর অনিরাপত্তা নিয়ে ভোর চারটার দিকে যখন ভাটারায় আশ্রয় চাইতে গেল, কেউ তাকে বিশ্বাস করেনি।

আমরা জানি বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি ৯৮.১% ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে ৬৩.৬%, ১৫ বছর বয়সোর্ধ্ব নারীদের ৫৭% অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে, সংসদের ২০% আসন নারী জনপ্রতিনিধিদের দখলে, তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ৮০% নারী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৯.৪% নারী। কিন্তু এসব উপাত্তের পরেও ২০৮ জন নারীর ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাগুলোয় ১১৭টি মামলা নথিভুক্ত হওয়া, তাদের মধ্যে ২৯জনের মৃত্যু হওয়া ও ৪জনের আত্মহত্যা করার লজ্জা বাংলাদেশ কিভাবে সহ্য করে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারিনা।

বিশ্ব ব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক উন্নয়ন রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, প্রতিবছর শ্রমশক্তিতে পুরুষদের অবদানের বিপরীতে নারীর অবদান ৮২%। এই হার দেখে বোঝা যাচ্ছে প্রতি বছর ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন নারী নতুন করে এই শ্রমশক্তিতে নিজেদের যুক্ত করেছে। এই হার এটি সম্ভাব্য জিডিপি-র প্রবৃদ্ধির হারকে ১.৮% বাড়াবে, যা ২০২১ সালের মধ্যে ৭.৫% প্রবৃদ্ধিতে নিয়ে যাবে। যখন আমরা এতই বুঝতে পারি, এতই বলতে পারি, এতই ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি নারীদের নিয়ে, তখন এই ২১ বছির বয়সী একটি পাহাড়ি নারীকে নিরাপত্তার না দিতে পারার গল্পটি আমাকে কেন বলতে হল? প্রতিটি ২১ বছর বয়সী নারী কেন দেশটির প্রতি আর আস্থা রাখতে পারে না? অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে অভিযোগ-অনুযোগ না করে, মাঝে-মধ্যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ না করে আমরা কি যৌন হয়রানির শিকার এসব নারীদের জন্য প্রতি শুক্রবার পরিবারের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়ে একটি করে মোম জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করতে পারি না? আমাদের প্রতিবাদের ভাষা কি ঘরে ঘরে থাকা সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন নারীদের কাছে পৌঁছাবে, যারা প্রতিনিয়ত এধরনের সমস্যার পরোক্ষতম পরিস্থিতিরও শিকার হয়ে চলেছেন? ঘরের প্রতিটি নারী সপ্তাহে একবার তাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে এসে বাড়ির সামনেই একটি করে মোম জ্বালিয়ে দেশের সব নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে পারে, এটিই কি হতে পারে আমাদের চূড়ান্ত প্রতিবাদ? আমরা কি আমাদের এই প্রতিবাদকে শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠির গন্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় প্রতিবাদের স্তরে নিয়ে যেতে পারি?

আমাদের প্রতিবাদের আওয়াজ পরিবর্তন আনবেই। আমাদের চোখের জল অবশ্যই শুকিয়েই শেষ হবে না। গ্রিক পুরানের ফিলোমেলা তার ভগ্নিপতি টেরেয়াসের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিল, তার জিহ্বা কেটে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু তাকে দমানো যায়নি, সে তার নিগ্রহের কাহিনী কাঁথায় বুনে তার বোন প্রস্নেকে জানিয়েছিল। আমরা আমাদের এই ভূখন্ডে আর কোনো ফিলোমেলাকে বাকশক্তি হারাতে দেব না। আমরা প্রত্যেকে একেকজন করে প্রস্নে হতে চাই, যেন আমরা একাত্মা হয়ে আমাদের ধর্ষক পরিচয়ধারী পুত্র, স্বামী বা ভাইকে শাস্তি দিতে পারি।

সময় এসেছে প্রতিবাদের ভাষা পুনরুদ্ভাবন করার। সম্ভবত আমাদের আবারও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ১৯৭৫ সালের ২৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দুই বছরের কম সময়ব্যাপী জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন, যখন নির্বাচন ও মৌলিক অধিকারসমূহ স্থগিত ছিল, গণমাধ্যমসমূহ সেন্সরের মুখে ছিল এবং এক লক্ষেরও বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে ২৮ জুন ১৯৭৫ তারিখে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ করেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। দৈনিক পত্রিকাটি তাদের সম্পাদকীয় বিভাগ ফাঁকা রেখে পত্রিকা ছেপেছিল। ফাঁকা স্থানই সেদিন সবচেয়ে শক্তিশালী আওয়াজ তুলেছিল।

আজ আমিও এই কলামে আমার প্রতিবাদ জানাতে আমার লেখার চুম্বক অংশ চিহ্নিত করার যায়গাটি কালো রঙে লেপে দেয়ার অনুরোধ করছি।

Rubana Huq_1লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মোহাম্মদী গ্রুপ।
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার এ ২৭ মে সম্পদকীয় কলামে প্রাকশিত তার লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশ করল আমরা ঢাকা।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন