পুলিশ বিভাগ যদি নারীময় হত!

প্রকাশ: May 18, 2015
Untitled-1

পুলিশ বিভাগ যদি নারীময় হত!

ফাহমিদা খাতুন

সম্প্রতি ঢাকায় আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলা নিয়ে সর্বস্তরে সমালোচনা হচ্ছে। হামলায় আক্রান্তরা গত পয়লা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল তারিখে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ষবরণ উৎসবে আগত নারীদের যৌন হয়রানিকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলেন। বিনিময়ে তারা পুলিশের কাছ থেকে যা পেলেন তা বর্ণনার প্রয়োজন নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিই সব বলে দিয়েছে। পুলিশের একতরফা লাঠিচার্জ জিঘাংসার বিষ ঝরিয়েছে।

এই রকম ঘটনার পাশাপাশি দেশ গত চার দশকের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অকল্পনীয় রেকর্ড করেছে, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, লৈঙ্গিক বিভিন্ন ইস্যুতে উন্নয়ন ও নারী শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা পাচ্ছে। এদেশে নারীরা পুরুষদের মতোই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অর্থনীতির সভ প্রধান খাতগুলোতে অবদান রাখছে। সর্বোপরি যে দেশের সর্বময় ক্ষমতা এখন একজন নারীর হাতে, সেখানেই এই ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে গত দুই দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করে যাচ্ছেন নারীরা।

নারী প্রধানমন্ত্রীর দেশে নারীদের উপর আইন-শৃংখলাবাহিনীর এধরনের বর্বরতা প্রদর্শন কি বিরল? হলে ভালই হত। কিন্তু আইন-শৃংখলাবাহিনীর ভূমিকা লিঙ্গ, বর্ণ, দল বা সম্প্রদায় দিয়ে নির্ধারিত নয়। সেজন্যই আফ্রিকান-আমেরিকান রাষ্ট্রপতি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান-আমেরিকানদের উপর পুলিশী নির্যাতনেরে খবর অনবরত পাওয়া যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্বে নারী বা পুরুষ যেইই থাক, পুলিশের ভূমিকা একই নীতিমালা দিয়ে নির্ধারিত। এই নীতিমালা শ্রেণিবৈষম্যের ভিত্তিতে তৈরি। যেসব আন্দোলনকারীকে পুলিশ ভয়াবহভাবে নির্যাতন করেছে তারা শাসক বা ক্ষমতাধর শ্রেণিভুক্ত নয়, তাই তারা এরকম আক্রোশের শিকার। রাষ্ট্রও আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশী হামলার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে রাজি হল না।

পুলিশ তার ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করবে আর আমজনতা, নারী ও বিরোধী দলীয় লোকজনের উপর, এটাই আমাদের দেশের নিয়মিত ঘটনা। বর্তমান মন্ত্রীসভার কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে পূর্বে পুলিশ কেমন আচরণ করেছিল তা আমরা দেখেছি। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী অবস্থানে থাকা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

যদিও ক্ষমতার পালাবদল হলেও সাধারণ জনগণের সঙ্গে পুলিশের আচরণ বদলায় না। ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠিকে পুলিশের উচিৎ বা অনুচিত ক্রোধ উভয়ই সয়ে যেতে হয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী, যারা পুলিশের সামনে কখনোই হুমকি নয় তাদেরকে নির্যাতন করেও বাহিনীটি আইনের ঊর্ধ্বেই রয়ে যায়। কারণ তারা শুধুমাত্র আগ্নেয়াস্ত্র বা বুট পরেই নিজেদের রক্ষা করছে না, তাদের রক্ষা করছে স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র।

আক্ষেপের বিষয় এখানে যা, পুলিশের সামনে যখন নারীরা অত্যাচারিত হয় তখন তারা তাদের এই ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে না। পরিবর্তে তারা এসব ঘটনাস্থলে নীরবতা পালনে স্বচ্ছন্দ। উপরন্তু তারা এসব পরিস্থিতি অস্বীকার করতে এবং নরম পন্থায় মোকাবেলা করতে চায়, যা অপরাধীদের এসব ঘৃণ্য কাজ চালিয়ে যেতে আশকারা দেয়।

আলোচ্য ঘটনায় আলোচিত পুলিশ সদস্যগণ যদি নারী হতেন তাহলে পরিস্থিতি কি অন্যরকম হত? সমগ্র পুলিশ যদি নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা হত এবং এই বাহিনীর নেতৃত্বে যদি একজন নারীই থাকতেন তাহলে পয়লা বৈশাখের সেই ঘটনার খলনায়কদের বিরুদ্ধে এতদিনে কি কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ত আমাদের?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরটি হল, না। পূর্বেই বলেছি, রাষ্ট্রক্ষমতায় নারী না পুরুষ রয়েছেন তা মুখ্য নয়, মুখ্য হল যিনি রয়েছেন তার ক্ষমতার পরিধি কতটা।

কিন্তু একটি সভ্য সমাজে পুলিশের ভূমিকা হওয়া উচিৎ রক্ষকের, আক্রমণকারীর নয়; শুভর সমর্থক, অশুভের নয়। সত্য হল বহু বছর ধরে পুলিশ বিভাগের চেহারা রাজনৈতিক বিভিন্ন উপাদানের প্রভাবে বেশ বড় মাত্রায় পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি আমাদের হাতে রয়েছে পুলিশের বীরোচিত কর্মকান্ডেরও দৃষ্টান্ত। দেশে আইন প্রতিষ্ঠায় ও জনজীবন রক্ষায় জীবনদানের মতো সর্বোচ্চ ত্যাগও করেছেন তারা। দুঃখজনক হল, মন্দ উদাহরণগুলো ভালগুলোকে ছাড়িয়ে যায়।

নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে পুলিশের মনোভাব পরিবর্তনে যথাযথ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সংবেদনশীলতার প্রয়োজন। কিন্তু দায়িত্বশীল গঠনতন্ত্র ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে এসব কাজ করবে না। দায়মুক্তির সংস্কৃতি তাদেরকে যা খুশি তাই করার মৌন সমর্থন দিচ্ছে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, প্রতিনিয়তই পুলিশ নতুন সব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই আইন-শৃংখলাবাহিনীটির শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। উন্নয়ন অংশীদারেরা পুলিশের সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছে। দেশের জনগণ ও পুলিশের অনুপাত বৃদ্ধি করতে ও কাজের প্রকৃতি অনুসারে পুলিশের বেতন বৃদ্ধি করতে সরকারকে আরও বরাদ্দ দিতে হবে। চূড়ান্তভাবে সবকিছুর দায়ভার সরকারের হাতে, কারণ দেশের শাসন ও আইনি অবস্থার নির্দেশক এই পুলিশ বিভাগ। এবং আমরা অবশ্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অক্ষম এক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই না।

fahসিপিডি’র গবষণা পরিচালক ও নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ফাহমিদা খাতুন ১৮ মে ২০১৫ তারিখে লিখেছেন এই লেখাটি। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা হল।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন