দুই বন্ধুর বাঁশকেল

প্রকাশ: May 13, 2015
7_221176

শুরুটা ২০১২ সালের অক্টোবরে। বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার তখনো মাসখানেক বাকি। এরই মধ্যে টাইফয়েডে আক্রান্ত হলেন সজীব। হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় পরীক্ষা দেওয়া হলো না। বিছানায় শুয়ে নানা কিছু ভাবতে ভাবতে মাথায় এলো বাঁশের সাইকেল তৈরির চিন্তা। অসুখ থেকে সেরে উঠে শুরু করলেন সাইকেলের ফ্রেমের ডিজাইন। সাহায্য করতে যোগ দিলেন বন্ধু সানজিদুল।

এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ক্লাস-পরীক্ষার চাপে পার হলো বছর দেড়েক। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে নতুন করে কাজ শুরু করলেন দুই বন্ধু। এর জন্য নানা জায়গায় ঘুরে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিলেন। কাঁটাবন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি অফিসার ড. খাইরুল ইসলাম পরামর্শ দিলেন সাইকেল মজবুত করতে ‘রেঙ্গুনি’ বাঁশ ব্যবহারের। গাজীপুর থেকে আনা হলো সেই বাঁশ। সেটিকে টেকসই করতে দু-তিন দিন পানিতে রেখে তাপ দেওয়া হলো। পোস্তগোলা থেকে কেনা হলো একটি পুরনো সাইকেল। সজীব জানালেন, ‘সাইকেলের ফ্রেমে ভারসাম্য রক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি অ্যারোস্পেসের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদেশে সাইকেলে ভারসাম্যের বিষয়টি দেখভাল করেন অ্যারোস্পেস বিজ্ঞানীরা।’ এ বিষয়ে আরো পারদর্শী হতে অনলাইনে অ্যারোস্পেসের একটা কোর্সও করে নিলেন দুই বন্ধু। শুরু হলো সাইকেলের ফ্রেম তৈরির কাজ।

প্রথম সাইকেলটি তৈরি করতে সময় লাগে মাত্র ২০ দিন। খরচ হয় সাড়ে চার হাজার টাকা। একটি প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি করেছিলেন সেটি। ২০১৪ সালে ‘ডিসিসিআই এন্টারপ্রেনারশিপ ইনোভেশন এক্সপো ‘ প্রতিযোগিতায় সবার নজর কাড়ে ‘বাঁশকেল’ নামের এই সাইকেল। অনেকেই তখন আর্থিক সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু দুই তরুণ অন্য কারো আর্থিক সহযোগিতা নেননি কাজের স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে। প্রতিযোগিতা শেষে আরো উন্নত করে সাইকেলটির ফ্রেম তৈরি করেছেন পাঁচ মাস ধরে। তার পরও ছোটখাটো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে ফ্রেমে। এখন কাজ করছেন এই সমস্যাগুলো দূর করতে।

বাঁশ দিয়ে সাইকেলের ফ্রেম নির্মাণ করা এই দুই তরুণের একজন সজীব বর্মণ। পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষে। আরেকজন সানজিদুল ইসলাম। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএর ছাত্র তিনি। দুজনই পুরান ঢাকার বাসিন্দা।

বাঁশের সাইকেল

বাঁশের তৈরি সাইকেল কাঠামোর সুবিধা হচ্ছে, এটা পরিবেশবান্ধব। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা ফ্রেম তাপ সহনশীল, এসব ফ্রেমের ওজন মাত্র এক থেকে দুই কেজি পর্যন্ত করা সম্ভব। তা ছাড়া একই ভরের লোহার তুলনায় বাঁশ অধিক ভার বহনে সক্ষম। সজীব বললেন, ‘বাঁশের তৈরি সাইকেল ১০ বছর পর্যন্ত কোনো সমস্যা ছাড়াই চলতে পারে।’

সানজিদুল যোগ করলেন, ‘বাঁশ টেকসই ও হালকা। পাশাপাশি কম শোষণক্ষমতার কারণেই সাইকেলের কাঠামো তৈরির অনন্য একটি উপাদান এটি। অনেক ধাতুর তুলনায় এর সহনক্ষমতা অপেক্ষাকৃত বেশি এবং দামের দিক থেকে অনেক সাশ্রয়ী। ইস্পাত ও অন্যান্য ধাতুর চেয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাপে বাঁশ কাটা অনেক সহজ। এই কাঠামোর বাইরে অন্য অংশ, যেমন টায়ার, ব্রেক, চেইন, প্যাডল ইত্যাদি সাধারণ সাইকেলের মতোই।’

বাঁশের সাইকেলের ধারণা নতুন নয়। ১৮৯৪ সালে প্রথম বাঁশের সাইকেল প্রদর্শিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৩ সালে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওজোন সাইক্লেরি’র নকশাকার ড্যান ভোগেল-এসেঙ্ ও স্টেফান তৈরি করেছিলেন বাঁশের সাইকেল। সজীব জানালেন, কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি অভাব অনুভব করেছেন টাকা আর ভালো একটা ল্যাবরেটরির। এখনো সাইকেলের কাজ চলছে সানজিদুলের বাড়ির বারান্দায়ই। ‘আমরা কোনো জিগ (কোনো কিছুকে শক্তভাবে আটকানোর জন্য ব্যবহার করা সরঞ্জাম) ছাড়াই হেড টিউব অ্যাঙ্গেল, সিট টিউব অ্যাঙ্গেল ঠিক করেছি। এ জন্য হেড টিউব অ্যাঙ্গেলের চার ডিগ্রি কৌণিক বিচ্যুতি ঘটেছে। তবে নতুন ডিজাইনে আমরা এসব সমস্যা দূর করেছি।’ বললেন সজীব।

বাঁশ ছাড়া ফ্রেমের জয়েনিংয়ের জন্য সাইকেলে ব্যবহার করা হয়েছে রেজিন (এক ধরণের আঠা) আর পাটের আঁশ। রেজিনের জয়েন্ট কতটা মজবুত হবে-এ প্রশ্নের জবাবে ইমন জানালেন, ‘হেলিকপ্টারের পাখার ব্লেডও রেজিন দিয়ে মেরামত করার উদাহরণ আছে।’ নিজেদের ডিজাইন করা সাইকেল নিয়ে এর মধ্যে ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি ভ্রমণ করেছেন দুজন। বাজারে পাওয়া আর সব সাইকেলের মতো এই ফ্রেমেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযুক্ত করা যাবে বলে জানিয়েছেন সানজিদুল।

সামনে নিজেদের তৈরি ‘বাঁশকেল’-এ চড়েই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সফরের পরিকল্পনা দুই বন্ধুর।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন