আমাদের নাটকের ভেতর-বাহির

প্রকাশ: May 11, 2015
cultureblog_1199728440_1-theatre

নাটক সাহিত্যের একটি বিশেষ ধরণ। সাধারণত একটি লিখিত পাণ্ডুলিপি অনুসরণ করে অভিনয় করে নাটক পরিবেশিত হয়ে থাকে। নাটক লেখা হয় অভিনয় করার জন্য। তাই নাটক লেখার আগেই তার অভিনয় করার যোগ্য হতে হয়। নাটকে স্থান, সময় ও পরিবেশের বর্ণনা ছাড়াও সংলাপ লেখা থাকে। সংলাপ বলেই একজন অভিনতা নাটকের বিভিন্ন বিষয়ে বলে থাকেন। তবে সংলাপই শেষ কথা নয়। সংলাপবিহীন অভিনয়ও নাটকের অংশ। আমাদের নাটক নিয়ে লিখছেন আলমগীর রেজা চৌধুরী। তার লেখাটি হবহু তুলে দেয়া হল-

আমাদের নাটকের ভেতর-বাহির

আমাদের নাটকের বয়স প্রায় ২শ’ বছরের কাছাকাছি। সময়ের হিসাবে অনেক। শুরু থেকেই নাটকের যে চরিত্র তা স্থানীয়ভিত্তিক রাজা, জমিদার, ভূস্বামীদের পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও নাটকের কাহিনী, চরিত্র, বক্তব্য ছিল আপোসহীন। মঞ্চশিল্পীরা উচ্চকণ্ঠে পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেই আসল, সত্যনিষ্ঠ, মানবিক চিত্রই পরিবেশন করেছেন। এদিক দিয়ে নাট্যকর্মী, যাত্রাশিল্পী, নাট্যকারগণ কোনরূপ আপোস করেনি। এই প্রত্যয়ধর্মী প্রণোদনার কারণে আমাদের ঐতিহ্যময় ধারায় এখনও নতুন নতুন প্রকাশ-বিন্যাসে জাজ্বল্যমান।
1428236772
এখনও ভারতবর্ষ থেকে বাংলা নাটকের থেকে বাংলা নাটকের চরিত্রে উৎকর্ষ মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হওয়ার পর ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নাটকের পরিবর্তিত রূপ শৈল্পিক এবং দর্শক গ্রহণযোগ্যতায় সফলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্বপাকিস্তানে তেমন কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়নি। এর কারণ বলা যায়, পাকিস্তানের শাসককুলের প্রাদেশিক বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি সাংস্কৃতিক উদাসীনতাই কাজ করেছে বেশি। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে সংস্কৃতিসেবীদের ওপর পাকিস্তান যন্ত্র যে কী পরিমাণ স্টিমরোলার চালিয়েছিল তার জন্য মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটি জেলখানায় মঞ্চস্থ হয়ে প্রমাণ করেছিল, সত্যনিষ্ঠ কণ্ঠস্বর কখনও অবদমিত করা যায় না। কলকাতা যখন মঞ্চ নাটকের ডামাডোল শুরু হয়েছে তখন ঢাকার অফিস-আদালতের বার্ষিক অনুষ্ঠানের বিনোদন মাধ্যম হিসেবে নাটক ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যতিক্রম ছিল না তা নয়। বার্ষিক নাটকগুলোতে আমাদের নাট্যকর্মীদের পরিবেশনায় যে বৈচিত্র্যের প্রকাশ পেয়েছে তাতেই অনুধাবন করা গিয়েছিল সুস্থ, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক অবকাঠামোতে নাটক সুকুমার পথ খুঁজে নিতে পারবে। তারপরও ‘ড্রামা সার্কেল এদেশের মঞ্চ নাটকের পথিকৃৎ-এর ভূমিকা পালন করেছে। তাছাড়া আমাদের নাট্যকারদের হাতে রচিত হয়েছে কালোত্তীর্ণ কিছু নাটক। যেমন মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’। আসকার ইবনে শাইখের ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’, সাঈদ আহমদের ‘কালবেলা’, নুকল মোমেনের ‘নেমেসিস’, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর ‘বহিপরী’ প্রভৃতি নাটকে সমকালীন জীবন, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক ছবি রয়েছে। যা চিরকালীন এক চালচিত্রকে মনে করিয়ে দেয়।
pragoitihasik
১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বরের পর হঠাৎ করে আমাদের মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। মঞ্চে আবির্ভূত হয় অনেকগুলো দল বা নাট্যগোষ্ঠী। ড্রামা সার্কেল, নাগরিক, থিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার, বহুবচন, আরণ্যক, ময়মনসিংহের বহুরূপী, চট্টগ্রামের অরিন্দমসহ রাজধানী এবং মফস্বল শহরেও অনেক নাট্যদল গড়ে ওঠে। যারা আমাদের নাট্যজগতে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে। সৃজনশীল এ নাট্যগোষ্ঠীগুলো ‘শুধু বিনোদনের জন্য নাটক নয়, নাটক জীবনের অন্য এক সত্যনিষ্ঠ উৎসারণ’ এ বক্তব্য সামনে নিয়ে এগিয়ে যায়। শুধু অভিনয়ে কারিশমা নয়, মঞ্চ লাইটিং বক্তব্যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়। আর পরিবেশনাগুলো হয়ে ওঠে শিল্পমন্ডিত। এক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয়, মঞ্চনাটকের উপযুক্ত মঞ্চ ঢাকায় তখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। আমাদের নাট্যকর্মীরা বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চ, পুরান ঢাকার লালকুঠি এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট এ নাটকের নিয়মিত প্রদর্শন করতে থাকে এবং দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। এর মধ্যে চলতে থাকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতি বিনিময়। এ প্রেক্ষিতে আমাদের নাটক কলকাতায় প্রদর্শিত হয়। দর্শককুল ভুয়সী প্রশংসা করে। বক্তব্য বিষয়, মঞ্চ, আলোকপাতসহ প্রতি প্রদর্শিত নাটক উপচেপড়া দর্শককুল টানতে সমর্থ হয়। ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রবীণ নাট্য সমালোচক রূপক সেন লেখেন, ‘দেখেছিলুম অহীন্দ্র চৌধুরীর অভিনয়, অনেক দিন পর দেখলুম ঢাকার নাটক। কেমন বুক চিতিয়ে অভিনয় করে গেল।’
Moncho 2_1
সত্যিকার অর্থেই আমাদের অভিনেতারা বুক চিতিয়ে নাটকের জন্য শ্রম দিয়েছেন। তার ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতার দু’তিন বছরের মধ্যে নাটকের ক্ষেত্রে আমাদের উৎকর্ষ দেশ থেকে দেশান্তরে সবক শ্রেণীর দশকের হৃদয়গ্রাহী হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তীতে আমাদের নাটকের এই যে শৈল্পিক রূপান্তর তা মূলত নাট্যকর্মীদের নিরলস ভালবাসার ফসল। যাঁরা এই বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন তাঁরা স্বাধীনতা পূর্ব থেকে এ কলায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন। শুধু পরিবেশগত কারণে তাদের কর্মফল বিকশিত হতে পারেনি। আমার বিশ্বাস, ৭১ পরবর্তীতে এ দেশের যেসব ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে, তার মধ্যে কবিতা এবং নাটকেই সর্বাগ্রে স্থান দিতে চাই। আমাদের নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টগোষ্ঠী, নাট্যকার, নির্দেশক, নটসহ কারিগরি ক্ষেত্রে ভিন্নমাত্রা রচনা করেছে, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন