ঢাকার ঐতিহ্য বাহী খাবার বাকরখানি

প্রকাশ: May 11, 2015
bakorkhani-110711-k-kantha

বাকরখানি ময়দা দিয়ে তৈরি রুটি জাতীয় খাবার বিশেষ। এটি বাংলাদেশের পুরান ঢাকাবাসীদের সকালের নাস্তা হিসাবে একটি অতি প্রিয় খাবার। ময়দার খামির থেকে রুটি বানিয়ে তা মচমচে বা খাস্তা করে ভেজে বাকরখানি তৈরি করা হয়। ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের বাকরখানি পাওয়া যায় পুরান ঢাকায়। বাকরখানি তে সাধারণত ময়দার সাথে স্বাদবর্ধক আর কিছু দেয়া হয় না। তবে চিনি দেয়া বাকরখানিও একেবারে বিরল নয়।ঢাকার একসময়ের প্রসিদ্ধ রুটির মধ্যে অন্যতম ছিল এই বাকরখানি। বাকরখানি এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে এটি উপঢৌকন হিসেবে প্রেরিত হতো। এখনও পুরনো ঢাকার কোনো কোনো অঞ্চলে তৈরি হয় বাকরখানি। সেখানে তা ‘শুখা’ (শুকনো) নামেও পরিচিত।
মুঘল আমলের খাবারগুলো মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বাকরখানি রুটি। লোকমুখে প্রচিলত আছে আগা বাকেরের নাম অনুসারে এই রুটি তৈরী হয়েছে। এই রুটি আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় পাওয়া যায়। প্রকৃত বাকরখানি খাঁটি ময়দা, ঘি, মাওয়ার খামির ও দুধ দিয়ে তৈরী করা হয়।
ঢাকায় যেভাবে তৈরী করা হয়
ময়দা, সাথে সামান্য খাবার সোডা, ডালডা, একটি তন্দুর এবং এর মাঝে উত্তাপ ছড়ানো জ্বলন্ত কয়লা। ব্যস, হয়ে গেল যোগান। প্রথমে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় ময়দা, সামান্য পানি এবং ডালডার সমন্বয়ে খামীর তৈরী করা হয়। এবার তৈরীকৃত খামীর থেকে কেটে ছোট ছোট গোলাকার কোয়া তৈরী করা হয়। এবার কোয়াটি বেলুনের সাহায্যে পাটার উপরে সামন্তরাল ভাবে ছোট গোলাকার কাঁচা রুটি তৈরী করা হয়। কাঁচা রুটির মাঝখানে ছুড়ি দিয়ে লম্বা করে তিনটি দাগ কেটে দেওয়া হয়। এবার এর এক পাশে পানির সামান্য প্রলেপ দিয়ে তন্দুরের দেয়ালে আটকিয়ে দেয়া হয়। ৫ থেকে ৭ মিনিট অপেক্ষার পর তৈরী বাকরখানি রুটি। আবার ঘৃত দিয়েও বিশেষ যত্নের সাথে এই রুটি তৈরী করা হয়ে থাকে। তবে ক্রেতাকে ঘৃত আলাদাভাবে কিনে দিতে হয়। পনির দিয়েও এই রুটি বিশেষ কায়দায় তৈরী করা হয়ে থাকে। ঠিক একই রকমভাবে ক্রেতাকে পনির আলাদাভাবে কিনে দিতে হয়। এখন অবশ্য প্রায় দোকানে পনির রুটি তৈরী করা থাকে। ঈদুল আযহা এর উৎসবে কোরবানীকৃত গরু বা খাশীর মাংশের ঝুড়ি দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই রুটি তৈরী করা হয়ে থাকে।
বাকরখানির রকমারি ও প্রপ্তিস্থান
চানখাঁরপুল পার হয়ে নাজিমুদ্দিন রোড, এ সড়কের দুই পাশে পর পর অনেক দোকান। বিভিন্ন আকৃতি ও স্বাদের বাকরখানি পাওয়া যায় এখানে। আছে কাবাব বাকরখানি, চিনি বাকরখানি, ছানা বাকরখানি, খাস্তা বাকরখানি, নোনতা বাকরখানি, পনির বাকরখানি, নারিকেল বাকরখানি, ঘিয়ের বাকরখানি, মাংসের বাকরখানিসহ এ খাবারের আরো অসংখ্য পদ। সাধারণ বাকরখানির প্রতিটির দাম দুই টাকা থেকে চার টাকা হলেও কাবাব, পনির বা মাংসে বানানো এ খাবারের দাম একটু বেশি। অর্ডার দিয়েই বানিয়ে নিতে হবে আপনাকে।
এসব দোকানের বাকরখানিই মোড়কজাত করে শহরের অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডি, উত্তরা, বনানী, গুলশানের ডিপার্টমেন্ট স্টোরে সরবরাহ করা হয়। চকবাজার, আমলিগোলা, নাজিরাবাজার, বংশাল, ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, আবুল হাসনাত রোড, সিদ্দিকবাজার, বনগ্রাম, মৈশুণ্ডি, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর, একরামপুর, গেণ্ডারিয়া, নারিন্দা, দয়াগঞ্জসহ পুরান ঢাকার প্রায় সব এলাকায় রয়েছে বাকরখানির দোকান।

ইতিহাস

বাকরখানি রুটির নামের পেছনে আছে এক করুণ ইতিহাস। জনশ্রুতি অনুসারে, জমিদার আগা বাকের তথা আগা বাকির খাঁর নামানুসারে এই রুটির নামকরণ করা হয়েছে। নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁর দত্তক ছেলে আগা বাকের। প্রখর মেধার অধিকারী আগা বাকের যুদ্ধবিদ্যাতেও পারদর্শী ছিলেন। রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগম এবং আগা বাকের পরস্পরের প্রেমে পড়েন। কিন্ত উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খান ছিল পথের কাঁটা, সে খনি বেগমকে প্রেম নিবেদন করলে তিনি জয়নাল খানকে প্রত্যাখান করেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে জয়নাল খনি বেগমের ক্ষতির চেষ্টা করে এবং খবর পেয়ে বাকের সেখানে যান ও তলোয়ারবাজিতে জয়নালকে হারিয়ে দেন। অন্যদিকে জয়নালের দুই বন্ধু উজিরকে মিথ্যা খবর দেয় যে, বাকের জয়নালকে হত্যা করে লাশ গুম করেছে। উজির ছেলের হত্যার বিচার চায়। নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁ পুত্র বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। অবশেষে বাকেরের হাতে মারা যায় বাঘ। ইতিমধ্যে জয়নালের মৃত্যুর মিথ্যা খবর ফাঁস হয়ে গেছে ও সে জোর করে খনি বেগমকে ধরে নিয়ে গেছে দক্ষিণ বঙ্গে। উদ্ধার করতে যান বাকের খনি বেগমকে। পিছু নেন উজির জাহান্দার খান। ছেলে জয়নাল খান বাকেরকে হত্যার চেস্টা করলে উজির নিজের ছেলেকে হত্যা করেন তলোয়ারের আঘাতে। এই অবস্থাতে জয়নাল খনি বেগমকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করে। বাকেরগজ্ঞে সমাধিস্থ করা হয় খনি বেগমকে। আর বাকের সবকিছু ত্যাগ করে রয়ে গেলেন প্রিয়তমার সমাধির কাছে –দক্ষিণ বঙ্গে। বাকের খাঁর নামানুসারেই বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ (পটুয়াখালি-বরিশাল) অঞ্চলের নাম হয় বাকেরগঞ্জ। ঐতিহ্য্যবাহী বাকরখানি রুটির নামের পেছনেও রয়েছে বাকের-খনির প্রেমের ইতিহাস।অবশ্য নামকরণের ব্যাপারে অন্য আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে। সে অনুযায়ী, মির্জা আগা বাকের ঢাকায় বাকরখানি রুটি প্রচলন করেন। তিনি বৃহত্তর বরিশালের জায়গীরদার ছিলেন। তার প্রেয়সী ছিল আরামবাগের নর্তকী খনি বেগম। তাদের মধ্যে গভীর প্রেম ছিল বলে কথিত আছে। পরবর্তীতে আগা বাকের ২য় মুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যাকে বিয়ে করেন। কিন্তু খনি বেগমের স্মৃতি তিনি ভুলে যান নি। তার আবিস্কৃত এবং প্রিয় খাদ্য বিশেষভাবে তৈরি রুটির নাম তার প্রেমকাহিনীর উপর ভিত্তি করেই নামকরণ করা হয়েছিল বাকের-খনি রুটি। পরবর্তীতে এই নাম কিছুটা অপভ্রংশ হয়ে বাকরখানি নাম ধারণ করে।জনশ্রুতি মেনে নিলে ধরে নিতে হয়, বাখরখানির সৃষ্টি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে।
ঢাকার আদিবাসীরা ছিলেন ভোজনবিলাসী, খাদ্যরসিক। তাদের এ অভিধাকে বাঁচিয়ে রাখতেই যেন এ ফাস্টফুডের যুগেও সগৌরবে টিকে আছে এ ঐতিহ্যবাহী এ খাবার।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন