কিশোর চালক, শিশু হেলপার অহরহ দুর্ঘটনা

প্রকাশ: June 21, 2015
shishu shrom

রাজধানীর পরিবহন খাতে শিশু শ্রম নিয়ে ২১ জুন ২০১৫ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নিয়মিত চলছে লেগুনাসহ নানা নামে পরিচিত ছোট গাড়িগুলো। এসব গাড়ির চালক এবং হেলপারদের বেশিরভাগই শিশু-কিশোর। এসব চালকের গাড়ি চালানোর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। এছাড়া কিশোর চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। অন্যদিকে গাড়ির পেছনে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে শিশু হেলপার। এরইমধ্যে চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ে হেলপারের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

জানা যায়, রাজধানীতে প্রায় ২০টি রুটে প্রায় ১ হাজার ২০০টি লেগুনা চলাচল করে। এর মধ্যে ফার্মগেট থেকে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা ও কৃষি মার্কেট এই তিন রুটে ঢাকা ইন্দিরা পরিবহনের প্রায় ১২০টি লেগুনা চলে। গাবতলী-মহাখালী রুটে ৬০টি, মিরপুর-মহাখালী রুটে ৭০, মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান হয়ে বাড্ডা পর্যন্ত ৮০টির মতো লেগুনা চলে। এছাড়া নীলক্ষেত থেকে ফার্মগেট, গোড়ান থেকে গুলিস্তান, মিরপুর ১ নম্বর থেকে জিগাতলা, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ, গুলিস্তান থেকে লালবাগসহ আরও কয়েকটি পথে লেগুনা চলাচল করে।

ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর এবং গুলিস্তান বাসস্টান্ডে তিনদিন অবস্থান করে দেখা যায়, কয়েক মিনিট পরপর লেগুনা আসা-যাওয়া করছে। এসব লেগুনার অনেক চালকই কিশোর বয়সী। আর এসব লেগুনার হেলপার মূলত ৮ থেকে ১২ বছরের শিশুরা।

মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান-বাড্ডা রুটে লেগুনা চালায় ১৬ বছর বয়সী সোহাগ। কথা প্রসঙ্গে সোহাগ জানায়, তিন বছর হেলপারি করার পর রাতের বেলা একটু একটু করে চালাতে দিতো চালক। এভাবেই গাড়ি চালানো শিখছি। এখন ছয় মাস ধরে নিজেই চালাই।

মিরপুর ১ নম্বর থেকে মহাখালী পথে চলাচলকারী অনেকগুলো লেগুনার চালক কিশোর। এই রুটে লেগুনা চালায় হূদয়। বয়স ১৫ বছর। দুই বছর হেলপারির কাজ করার পর এক বছর আগে চালক হয়েছে সে। হূদয় জানায়, বয়সে ছোট হলেও আমাদের হাত খুব পাকা। এই লাইনে যত চালক গাড়ি চালায়, অনেকেরই আসল লাইসেন্স নাই। আর ঢাকায় গাড়ি চালাতে এখন এত কিছু জানা লাগে না, মনে সাহস থাকলেই চলে।

ফার্মগেট থেকে মোহাম্মদপুর রুটের একটি লেগুনার হেলপার জসীম। বয়স ১০ বছর। কথা প্রসঙ্গে জসীম জানায়, বাড়ি বরিশালের হিজলা উপজেলায়। মায়ের সঙ্গে থাকে কড়াইল বস্তিতে। সংসারের হাল ধরতেই এই পেশায় এসেছে। স্বপ্ন দেখে একদিন চালকের আসনে বসবে সে।

ইন্দিরা পরিবহনের পরিচালক দেলোয়ার হোসেন চুন্নু বলেন, খাওয়ার টাকা জোগাতে গিয়ে অল্প বয়সী শিশুরা হেলপারি করতে করতে গাড়ি চালানো শেখে। আমরা তাদের নিতে চাই না। তবে সংসার চালাতে হয় এসব শিশু-কিশোরদের। অনেক সময় কান্নাকাটি করে। মানবিক দিক বিবেচনা করে অনেকটা বাধ্য হয়ে সুযোগ দিতে হয়।

গণপরিবহনের স্বল্পতা এবং অনেক স্থানেই বাসের চলাচল না থাকায় যাত্রীরা বাধ্য হয়েই এসব ছোট গাড়িতে উঠছেন। এসব ছোট গাড়ির একজন যাত্রী সাজিদ আরাফাত। ফার্মগেটে বসে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, দীর্ঘক্ষণ গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাই গাড়ি এলে চালক-হেলপারের চেহারা দেখার সময় থাকে না। আমি না উঠলেও অন্য কেউ উঠবে। না উঠে তো উপায় নেই। বাসায় তো যেতে হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ধারায় শিশুদের সুবিধাপ্রাপ্তি-সংক্রান্ত বিশেষ বিধান রয়েছে। শ্রম আইন, ২০০৬ অনুসারে, কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স হচ্ছে ১৪ বছর আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে তা ১৮ বছর। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে হালকা কাজ করলে সেটাকে ঝুঁকিমুক্ত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা তাদের পড়vশুনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না।

এ প্রসঙ্গে শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারপারসন এমরানুল হক চৌধুরী জানান, শিশু শ্রম আইন ২০১৩-তে ১৮ বছরের নিচের সবার জন্য গাড়ির হেলপারের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। হেলপারির কাজই যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে শিশু-কিশোরদের চালক হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। এসব শিশু-কিশোরকে যারা কাজে নিয়োগ করেছেন, তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। জনগণ ও যাত্রীদেরও এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে বলে জানান তিনি।

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কমিউনিকেশন ও শিশু সুরক্ষা সমন্বয়কারী মো. গোলাম এহছানুল হাবিব জানান, যেকোন শিশুশ্রম বন্ধে ২০১৩ সালের শিশু আইনের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা নির্দিষ্ট করে কোনো এলাকাকে শিশুশ্রম মুক্ত বলতে পারব না। সার্বিকভাবে শিশুশ্রম হয়তো নির্মূল করাও সম্ভব নয়। তবে আইন ও পলিসির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করলে এর তীব্রতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন বলছে, শিশুশ্রমের এখনকার প্রবণতার উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো শহরমুখিতা শিশুরা গ্রামাঞ্চল থেকে কেউ পরিবারসহ কেউবা পরিবার ছাড়া শহরে আসছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রকল্প সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রধানত অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে। শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। কিন্তু এটি চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন