সর্বনাশা পলিথিনে চোখ নেই সরকারের

প্রকাশ: June 21, 2015
poly ethylene

নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগের পুনরায় বিস্তার নিয়ে ২১ জুন ২০১৫ তারিখে কালের কন্ঠে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ আবার ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফিরতি মানুষের হাতে হাতে দেখা যায় পলিব্যাগ। রাজধানী কিংবা গ্রামের মধ্যে কোনো তফাত নেই, সব জায়গায় ক্রেতারা বাজার করতে যায় খালি হাতে। কিছু চেইন শপ আর হাতে গোনা দু-একটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে বাকি সব দোকানেই থাকে পলিব্যাগ। সব পণ্য সেই ব্যাগে ভরে ধরিয়ে দেওয়া হয় ক্রেতার হাতে। ক্রেতাও অবলীলায় তা নিয়ে বাড়ি এসে পরে ফেলে দেয় ডাস্টবিনে। সেখান থেকে পলিথিন ছড়িয়ে পড়ে সর্বনাশ করে পরিবেশের। ক্রেতা বা বিক্রেতা, কারো মধ্যেই পলিথিনের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা নেই। তাদের সচেতন করতে কোনো উদ্যোগও নেই। আইন থাকলেও নেই প্রয়োগ। বাজারে পাটের ব্যাগ পাওয়া যায়, তবে দাম বেশি বলে সেগুলো কেনা বা ব্যবহারের তাগিদ নেই ক্রেতাদের।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবীব বলেন, ‘পলিথিন একটি নীরব ঘাতক। এই পণ্যটি শত শত বছর পড়ে থাকলেও পচবে না বা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে না। আর নগরজীবনে পলিথিনের সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিক হলো, যত্রতত্র পলিথিন ফেলে রাখলে তা পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায়। আমরা দেখেছি, পলিথিনের কারণে ঢাকায় অল্প বৃষ্টিতে কিভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু করে ঢাকার প্রধান প্রধান জলাধার দূষিত ছিল পলিথিনের কারণে। আর এসব রোধ করতেই পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।’

ইকবাল হাবীব বলেন, ‘পলিথিন নিষিদ্ধ করাটা ছিল তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের একটি ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু মহাজোট সরকারের শাসনামলের প্রথম থেকেই আবার পলিথিনের ব্যবহার বাড়তে থাকে; প্রথমে গোপনে, এখন প্রকাশ্যেই হচ্ছে। এর অর্থ এটা নয় যে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পলিথিন বাজারে এসেছে। তবে এটা সত্য, পলিথিন রোধের ব্যাপারে সরকারের আগ্রহের ঘাটতি আছে। সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উদাসীনতায় পলিথিন আবারও বাজারে চলছে দেদার।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সোবাহান বলেন, আইন হওয়ার সময় বাংলাদেশের যত পলিথিন কারখানা ছিল তার চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি কারখানা এখন চালু রয়েছে। পলিথিন ব্যাগ উদ্ধার ও আটকের বিষয়ে আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তরের। আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। পলিথিন নিষিদ্ধ করার পর মানুষের ভেতরে সচেতনতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একটা সময় পর সরকারগুলোর উদ্যোগে ভাটা পড়ে। সরকার যদি আন্তরিকতার সঙ্গে আইন প্রয়োগ করে, তাহলেই কেবল পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এ দেশে গ্রামগঞ্জ ও শহরের মানুষ পাটের থলে, বাঁশ-বেতের ডোলা ইত্যাদি নিয়ে হাট-বাজার করত। একটি পাটের ব্যাগ বা ডোলা চলত বছরের পর বছর। এতে স্বাস্থ্য, অর্থ ও পরিবেশ- সব কিছুই সুরক্ষা পেত, সাশ্রয় হতো। দোকানিরা সদাই দিত কাগজের ঠোঙা ভরে। ওই বছর দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বিপণন ও বহুল ব্যবহার শুরু হয়। থার্মোপ্লাস্টিক-জাতীয় পদার্থ দিয়ে প্রস্তুত পলিব্যাগ ওজনে হালকা, সহজে বহনযোগ্য ও দামে সস্তা হওয়ায় অল্প সময়েই তা বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। চাহিদার জোগান দিতে পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে শত শত পলিথিন কারখানা। অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভ হওয়ায় এক শ্রেণির উদ্যোক্তা পলিথিন উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করে রীতিমতো একে শিল্পে রূপান্তরিত করে ফেলেন।

পরিবেশের সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন ভাবনা থেকে একপর্যায়ে পলিথিনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠতে থাকে। বিভিন্ন প্রামাণ্য গবেষণায় পরিবেশদূষণ ও পলিব্যাগে রাখা খাবার জনস্বাস্থ্যহানিকর প্রমাণিত হয়। বিশেষজ্ঞ মহল এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে থাকে। ১৯৯০ সালের ৬ জুন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) প্রথম পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধের আন্দোলন শুরু করে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন গবেষণা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, মতবিনিময় সভা, সেমিনারের মাধ্যমে পলিথিন ব্যাগের অপকারিতা তুলে ধরে। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে সারা দেশে বন্যা হলে যত্রতত্র ফেলানো পলিব্যাগ পয়োনিষ্কাশনসহ পানি সরে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ নিয়ে সে সময় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত হয়। পরিবেশবাদীরা পলিথিনের বিরুদ্ধে আরো সোচ্চার হন। এরপর বিএনপির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ক্ষতিকর পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬ক ধারা সংযোজনের মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হয়। একই বছরের ৮ নভেম্বর সরকার একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে বিস্কুট, চানাচুরের মোড়ক হিসেবে পলিথিনের ব্যবহার করা যাবে বলে জানায়। তবে সেই পলিথিনের পুরুত্ব অবশ্যই ১০০ মাইক্রেনের ওপরে হতে হবে বলে শর্ত দেয়। এই আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়, ‘কেউ যদি পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করে, তবে তার শাস্তি হবে ১০ বৎসরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। আর কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন সামগ্রী বিক্রি বা বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রদর্শন, গুদামজাত, বিতরণ ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে, তবে সে ক্ষেত্রে তার শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তিই প্রযোজ্য হবে।’

সরকার ওই সময় একই সঙ্গে পাটের ব্যাগ বাজারজাতকরণ এবং পলিথিন উৎপাদনকারীদের পুনর্বাসনেরও ঘোষণা দেয় এবং এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণও শুরু করে। প্রথম ধাপে রাজধানীতে বন্ধ করা হয় পলিথিন। এরপর সারা দেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয় অপচনশীল এই বস্তু। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জোরালোভাবে শুরু করে পলিথিনবিরোধী অভিযান। সে সময়কার পরিবেশমন্ত্রী নিজেও নেমে পড়েন মাঠে। এতে যত্রতত্র পলিথিনের ছড়াছড়ি ও পরিবেশের দূষণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসে।

এভাবে বহুদিন চলার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি আবার পাল্টাতে থাকে। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের আমল থেকে পলিথিনবিরোধী পদক্ষেপ অকার্যকর হয়ে পড়তে থাকে। ফলে আবার বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিন আসতে থাকে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঝেমধ্যেই পলিথিনবিরোধী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। জব্দ করা হয় নিষিদ্ধ পলিথিন। দায়ী ব্যক্তিদের জেল-জরিমানাও করা হয়। কিন্তু পলিথিন উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ হয় না। এ প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান পরিবেশমন্ত্রী মো. আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পলিথিনের বিরুদ্ধে সরকার এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রতিনিয়তই পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সবার আগে জনসচেতনতা প্রয়োজন। জনগণ যদি পলিথিন বর্জন করে, তাহলে এটি রোধ করা আরো সহজ হবে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মো. আলমগীর বলেন, ‘পলিথিনের উৎপাদন বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও মালামাল জব্দ করে কারখানা সিলগালা করা হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে অভিযান চালানো হয়। প্রভাবশালী অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি পলিথিন ব্যবসায় জড়িত। অভিযানে গেলে বাধা আসে। নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ করতে পরিবেশ অধিদপ্তর একা নয়, সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন এর দায় এড়াতে পারে না।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালে সারা দেশে প্রতিদিন ৪৫ লাখ পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার হতো। ২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ লাখে। আর ব্যবসায়ীদের দাবি, এখন প্রতিদিন সারা দেশে আনুমানিক এক কোটি ২২ লাখের বেশি পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে বর্তমানে বাজারে চলা পলিথিন ও নিষিদ্ধ হওয়া পলিথিনের মধ্যে পার্থক্য কেবল গঠন ও রঙের। নিষিদ্ধ হওয়ার আগে পলিথিন বিভিন্ন রঙের থাকলেও এখন শুধু সাদা রঙের পলিথিনই বেশি দেখা যায়। আর আগের পলিথিন শপিং ব্যাগে হাতল থাকলেও এখনকারগুলো হাতল ছাড়া ঠোঙা আকৃতির।

পুরান ঢাকার অলিগলিতে কারখানা : লালবাগ চৌরাস্তা পেরিয়ে চাঁদনীর ঘাট শিশু হাসপাতালের গেটে নিষিদ্ধ পলিথিনবোঝাই সারি সারি ঠেলাগাড়ি। হাসপাতালের উল্টো দিকের গলিতে তৈরি হচ্ছে এ পলিথিন, জানাল স্থানীয় লোকজন। গত ৩ জুন ক্রেতা সেজে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ কক্ষের বিশেষ কারখানার ভেতরে থরে থরে সাজানো লাল, সাদা ও কালো রঙের পলিথিন। সামনে ঠেলাগাড়ি ও ছোট ট্রাকে পলিথিন ওঠাতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। সেখানে উপস্থিত কারখানা মালিক মুজাহিদ আলী। ছয়-সাত বছর আগে ভবনটি ভাড়া নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘এমআর প্লাস্টিক’ নামের কারখানা। পলিথিন উৎপাদন ও বিক্রি নিয়ে মুজাহিদ কোনো কথা বলতে রাজি হলেন না।

পরদিন নবাবগঞ্জ বাজার থেকে ললিত মোহন দাস লেন, বাটা মসজিদ, ডুরি আঙ্গুর ও শহীদনগর হয়ে কামরাঙ্গীরচর এলাকা ঘুরে দেখা গেল এ রকম আরো অনেক কারখানা। ডুরি আঙ্গুর লেনে মিন্টুর কারখানা, কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রামে মজিবরের কারখানা এখন সচল নেই বলে দাবি করল অনেকে। তবে গোপনে উৎপাদন চলে বলেও জানাল কেউ কেউ। ইসলামবাগ, উর্দু রোড, লালবাগ ও কামালবাগ গেলে বেশ কিছু পলিথিন কারখানা ও গুদামের সন্ধান পাওয়া যায়। বেশির ভাগ কারখানার সাইনবোর্ড নেই। শ্রমিক, ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক পরিচয় গোপন রাখতে। উর্দু রোডের একটি কারখানার ম্যানেজার আতিক হোসেন পলিথিন উৎপাদন ও বিপণনের বর্ণনা দিলেও কারখানা মালিকের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হলেন না। উর্দু রোড, চকবাজার ও আজগর লেনে প্রায় ১৫টি পলিথিন কারখানার কথা জানাল স্থানীয় লোকজন। সেগুলো হাজি সাব্বির হোসেন নিয়ন্ত্রণ করেন। আর কামালবাগে ২০টি পলিথিন কারখানা নিয়ন্ত্রণ করেন শেখ মো. আমির হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কামালবাগে একটি পলিথিন কারখানা ছিল, এখন নেই। এখন শপিং ব্যাগ তৈরির মেশিন দিয়ে প্যাকেজিং করা হচ্ছে। তবে চকবাজারে একটি পলিথিনের দোকান আছে।’

রহমতগঞ্জ ও ডাইলপট্টির পেছনে প্রায় ১১টি পলিথিন কারখানার তথ্য জানা গেল স্থানীয় সূত্রে। রহমতউল্লাহ গার্লস স্কুলের পাশে একটি ও কমলদহ রোডে তিনটি পলিথিন কারখানা রয়েছে। লালবাগের এসব কারখানা নিয়ন্ত্রণ করছেন ওয়াহিদ, আলাউদ্দিন ও হাজি জিন্নাহ। রহমতগঞ্জ মসজিদের পাশে হাজি সাব্বিরের, এম সি রায় লেনে মোহাম্মদ আলীর, আবদুল আজিজ লেনে মঈনের, আমলীগোলা এলাকায় মুজিবের, পোস্তা পুলিশ ফাঁড়ির পাশে পলাশ হোসেন জুয়েলের, রহমতউল্লাহ মডেল বিদ্যালয়ের পাশে মিজানের, কামরাঙ্গীরচর লোহার ব্রিজের কাছে লতিফের, গোড়া শহীদ মাজারের পাশে খালেদ সাইফুল্লাহর কারখানায় এবং লালবাগ কেল্লার পাশে ভাই ভাই প্যাকেজিংয়ে প্রতিদিন টন টন পলিথিন উৎপাদন হচ্ছে বলে জানা গেল। ১৩ নম্বর কোমলদহ সড়কে সাহাবুদ্দিনের, ১৪ নম্বরে হাজি লুৎফুরের বাড়িতে তিন থেকে চারটি, ১৬ নম্বরে রেজি বেগমের বাড়িতে, ৫ নম্বরে উসমান হাজি ও লাখ হাজির বাড়িতে পাঁচটি কারখানা রয়েছে। খাজে দেওয়ান দত্ত সড়কে এনায়েত হাজি ও উমেজ হাজির বাড়ি, লালবাগের খাজে দেওয়ান প্রথম লেনে ইয়াজ প্যাকেজিং ও শরীয়ত প্লাস্টিক শপিং ব্যাগ উৎপাদন করছে। রাজধানীর মিরপুর, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, কামরাঙ্গীরচর ও টঙ্গীতে ছোট-বড় বেশ কিছু কারখানা রয়েছে। চট্টগ্রামসহ জেলা শহরগুলোতেও গড়ে উঠেছে পলিথিন কারখানা। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শতাধিক কারখানা।

দেশজুড়ে কারখানা : বাংলাদেশ পলিপ্রোপাইলিন প্লাস্টিক রোল অ্যান্ড প্যাকেজিং অ্যাসোসিয়েশন নামে বৃহৎ একটি পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী ছোট-বড় এক হাজার অবৈধ কারখানা রয়েছে। বিদেশ থেকে প্লাস্টিকের দানা ও পাউডার এনে কারখানাগুলোতে প্রতিদিন বিভিন্ন আকারের ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। উৎপাদন শেষে তা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।

ব্যবসায়ীরা জানান, পাতলা (নিষিদ্ধ) পলিথিন তৈরির মেশিনের দাম খুব বেশি না। পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকায় ভারতীয় ও চায়না মেশিন কেনা যায়। মেশিন স্থাপনের জন্য জায়গাও বেশি লাগে না। ছোট ঘরের মধ্যে এ মেশিন বসিয়ে দানাদার পলি ইথিলিন থেকে পাতলা পলিথিন তৈরি করা হয়। বিভিন্ন কারখানায় মোটা পলিথিন উৎপাদনের পাশাপাশি পলিথিনের শপিং ব্যাগও তৈরি হচ্ছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, একটি পাটের ব্যাগের দাম ৩০ টাকা। আর ৪০ টাকায় পাওয়া যায় বড় আকারের ১০০ পলিথিন ব্যাগ। ছোট ১০০ পলিথিন ব্যাগের দাম মাত্র ২০ টাকা।

সূত্র: কালের কন্ঠ

ব্যবহার বন্ধে ১৯ দফা সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

সহজপ্রাপ্তির কারণে ফের মানুষের হাতে ফিরে এসেছে নিষিদ্ধ পলিথিন। প্রকাশ্যেই পলিথিন উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে পরিবেশবাদীদের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন সবাই। টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান পরিচালনাসহ ১৯ দফা সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। কিন্তু অজানা কারণে এ উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে না।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে করণীয় নির্ধারণে সংসদীয় সাবকমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পাশাপাশি জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে প্রথম পলিথিনের বাজারজাত ও ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু ব্যবহারের পর এটি যত্রতত্র ফেলে দেওয়ায় তা পরিবেশ বিপর্যয়কারী পণ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয়, প্রদর্শন, মজুদ ও বিতরণ নিষিদ্ধ করে আইন পাস করা হয়। কিন্তু সুষ্ঠু তদারকির অভাবে সর্বত্র নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, মাটি উর্বরতা হারাচ্ছে, ভরাট হচ্ছে নদী এবং সড়কগুলো হয়ে পড়ছে অপরিচ্ছন্ন।

সূত্র মতে, দশম সংসদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির কার্যক্রমের শুরু থেকে নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ জমা হতে থাকে। গত ২৩ নভেম্বর সংসদীয় কমিটির বৈঠকে নিষিদ্ধ পলিথিনের যত্রতত্র ব্যবহার বন্ধে করণীয় নির্ধারণে ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্য টিপু সুলতানকে আহ্বায়ক করে একটি সাবকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে আওয়ামী লীগের সদস্য নবী নেওয়াজ ও স্বতন্ত্র সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনকে সদস্য রাখা হয়। সাবকমিটি সরেজমিনে বাজার পরিদর্শন ও কয়েক দফা বৈঠক শেষে প্রতিবেদন তৈরি করে মূল কমিটির কাছে জমা দিয়েছে। গত ৭ মে মূল কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি অনুমোদন করে সাবকমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ দিতে মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।

সাবকমিটির আহ্বায়ক টিপু সুলতান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অলিগলিতে অসংখ্য কারখানা নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন ও বাজারজাত করছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। আমরা পলিথিন নিষিদ্ধ করলেও বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ বা অন্য কিছু ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে সহজলভ্য করতে পারিনি।’

কমিটি সূত্র জানায়, সাবকমিটির প্রতিবেদনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে টাস্কফোর্স গঠন করে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে। র‌্যাব, পুলিশ ও মোবাইল কোর্টের সহায়তায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে অভিযান অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি বণ্টনের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির মুখোমুখি করা জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুপারিশে জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে আকর্ষণীয় প্রচারণার জন্যও বলা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারণা, পলিথিন ব্যাগের বিকল্প পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করা, স্বল্প মূল্যে বাজারে বিকল্প ব্যাগ সরবরাহ, পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করে কমিটি সুপারিশ প্রণয়ন করেছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত)-২০০২ অনুযায়ী, ১০০ মাইক্রোনের কম পুরুত্বের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করলে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আর বাজারজাত করলে ছয় মাসের জেল এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

সূত্র: কালের কন্ঠ

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন